Jim Morrison: জিম মরিসন যখন ‘রকস্টার’-এর জর্ডন
বেঙ্গলপিডিয়া অনলাইন: ‘রকস্টার’ শব্দটার সঙ্গে পরিচয় সবার আছে তবে শব্দের গভীরতা বুঝতে গেলে সেই যন্ত্রণার সঙ্গে একাত্ম হতে হবে (Jim Morrison)।
জিম থেকে জর্ডন (Jim Morrison)
৮০ এবং ৯০-এর দশক কলকাতার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, একদিকে পৃতিবীর বিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে শহরের চারপাশ। সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে পাশ্চাত্য সংগীত থেকে তার ভাব দর্শন। সেই সময় এক ১৮ বছরের বালক হঠাৎ করে পরিচিত হচ্ছে এক অদ্ভুত মাদকতার সঙ্গে। না এই মাদকতার কোনও টক্সিক কিছু না এ সুরের মাদকতা (Jim Morrison)।
চোখে তাঁর দ্রোহ আর ভিতরে কবি সত্ত্বা, এই নিয়ে সে তখন স্বপ্ন দেখছে রকস্টার হওয়ার। ততদিনে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে কফি হাউস আর তাঁকে নিয়ে সেই কালজয়ী গান। সেখানে গোয়ানিজ ডিসুজার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেছে মধ্যবিত্ত বাঙালির। কিন্তু আরেকজনের সঙ্গেও যে তখন বিশ্বের মত বাংলার সখ্যতা গড়ে উঠেছে। আর তিনি অন্য কেউ নন বিখ্যাত গায়ক জিম মরিসন।

প্যারিসের রাস্তা কিংবা ফ্লোরিডা, আকাশে রকগানের সুর ভেসে আসলেই যে কয়েকটি নাম প্রথম মাথায় আসে তাঁদের মধ্যে অন্যতম নাম জিম। পুরো নাম জেমস ডগলাস মরিসন। সংগীত প্রেমী মানুষদের কাছে নামটা যতটা জনপ্রিয় ততটাই ভালবাসা এবং আবেগের। কিন্তু যদি বলি ভারতীয় দর্শকদের কাছে দ্বিতীয়বার যে রকস্টার-কে দেখে রকস্টার হওয়ার স্বপ্ন গ্রাস করেছিল সেটা হল জর্ডন ওরফে জর্নাদন জাঁকর। ইমতিয়াজ আলি পরিচালিত বিখ্যাত সিনেমা ‘রকস্টার’ আর মুখ্য চরিত্রে ছিলেন রণবীর কপূর ও নার্গিস ফাখরী।

কবির সুমন তাঁর গানে একটা প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘কতটা পথ পেরোলো তবে পথিক হওয়া যায়?’ ঠিক সেই প্রশ্ন ধরে আরেকটা প্রশ্নের অবতরণ না করলে অপরাধ হবে। সেই আরেকটা প্রশ্ন হল ‘কতটা পথ পেরোলে তবে শিল্পী হওয়া যায়?’ এই প্রশ্নের উত্তরই যেন খুঁজতে চেয়েছিলেন ইমতিয়াজ আলি। কিন্তু এই সিনেমার মুখ্য চরিত্রে থাকা রণবীর কপূর ওরফে জর্ডন আসলে আসলে জিম মরিসনেরই প্রতিবিম্ব (Jim Morrison)।
শুধু তাই নয় সিনেমায়ও জিমের নাম আসে শুরুতেই। এমনকি পরিচালক জিম মরিসনকে ট্রিবিউট-ও জানিয়েছেন দৃশ্যায়নের মধ্যে দিয়ে। ‘Sadda Haq’ গানের যে দৃশ্যায়ন করা হয়েছে সেটাও জিম মরিসনের কনসার্টের ধরণে। ‘Sadda Haq’ আর জিমের ‘দ্য ডোরস’ একই কয়েনের দুটো দিক (Jim Morrison)।

তবে এই গল্পের গভীরে যেতে গেলে জিম মরিসনের জীবন নিয়ে আলোচনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জিম শুধু যে ‘দ্য ডোরস’ ব্যান্ডের গায়ক ছিলেন তা কিন্তু না। তিনি ছিলেন ভবঘুরে এক কবি, তিনি বিদ্রোহী। বরাবর ক্ষমতার বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেছেন। রাষ্ট্রীয় বহু বিষয়কে তিনি অমান্য করেছেন প্রকাশ্যে। আবার ‘রকস্টার’ সিনেমায়ও জর্ডন ঠিক তেমন, বারবার তাঁকে নিয়ে বিতর্ক হলেও তিনি নির্বিকার (Jim Morrison)।
মঞ্চে জিম মরিসনের উপস্থিতি ছিল একেক সময় একেক রকম। কখনও তিনি প্রচন্ড শক্তিশালী, কখনও আবার উদাস আবার কখনও প্রতিবাদী, সব সময় যেন তিনি কিছু খুঁজছেন। সেই পাখিটাটাকে খুঁজছে সে, যে পাখিটা বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ার কারণে ঘর ছাড়া। আবার এই নগরায়ণের বিরুদ্ধেই যেন প্রতিবাদে ফেটে পড়ছেন দুই জন। ভিড়ের মধ্যে শ্রোতা দর্শকদের চোখে দুজনেই রকস্টার আবার দুজন এক। সেখানে তাঁদের ভিতরের প্রতিছব্বির এক ঝলক দেখতে পাওয়া গেলেও পুরো তল পাওয়া সম্ভব হয় না। সেটা পেতে হলে তার কবিতা, লেখা এবং গানের কথা খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হয় (Jim Morrison)।

মরিসনকে গায়ক বা কবি এই দুই ভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। তাঁর কবিতা যেন তাঁর আত্মার প্রতিশব্দ। এখানেই ঘটছে প্রেম, মৃত্যু এবং তৈরি হওয়া এক শূন্যতার মহা মিলন। জীবন সরলরৈখিক নয় সেখানে সমস্যা সরলরেখায় চলে না বরং ঢাকা পরে আছে এক গভীর রূপকে। আবেগ এবং এক ধরণের অমোঘ সৌন্দর্য রয়েছে সেই অক্ষরে। সেখানে ছিল অবিরাম পরীক্ষা, সীমা ভাঙা, অনুভূতির প্রতি একই সঙ্গে দুর্বল এবং নিষ্ঠুর হওয়া।
এবার আবার যদি আসি ‘রকস্টার’ সিনেমার কথায়। সেখানেও রকস্টারের জন্ম অন্তরের কষ্ট থেকে। প্রেম থেকে যে অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছিল সেই গভীর স্থান থেকেই উঠে এসেছে তাঁর গানের প্রতিটা শব্দ। হিরকে হারিয়ে ফেলার পর জর্ডনের লড়াই কেমন হতে পারে? দর্শকের মনের মধ্যে জেগে থাকা সেই যন্ত্রণার প্রকাশই দেহ গেল বড় পর্দায়। নতুন করে ‘রকস্টার’-এর গল্প বললেন ইমতিয়াজ আলি।
মরিসনের লেখা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক ভগ্নাংশের মত। সহজ করে বললে প্রতিটা আলাদা লাইন একসঙ্গে একটা দৃশ্য নির্মাণ করে। ‘চেইনড সনস অব দ্য মুন’-এ তিনি লিখছেন, ‘আই সি মাইসেলফ ইন অ্যা ভিশন অব অ্যানাদার টাইম, হোয়্যার দ্য উইন্ড হুইসপারস সিক্রেটস নো ওয়ান আন্ডার্স্ট্যান্ডস।’ যেখানে মানসিক ভাগং, আকাঙ্খা এবং অস্থিরতা রয়েছে (Jim Morrison)।
মরিসনের কবিতার প্রধান যে বিষয়গুলো বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে সেগুলো হল—মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা, প্রেম, শারীরিক ও মানসিক সীমা পরীক্ষা। তিনি মানুষ, সমাজ, প্রেম সবকিছুকে তরল এবং পরিবর্তনশীল হিসেবে দেখতেন। মৃত্যুর প্রতীক, যৌনতা ও নেশা—সবই নতুন অর্থ পায় তাঁর লেখায়, এবার সেটা কখনও গান আবার কখনও কবিতা। জিমের কাছে ধ্বংস কেবল ধ্বংস নয়, এখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন উপলব্ধি। কবিতা শেখায়, ব্যথা অনুভব করা যায় এবং তা থেকে শিল্প তৈরি করা যায় (Jim Morrison)।
আরেকটা গানের কথাই যদি ধরি তবে, ‘দ্য নাইট কলস মাই নেম, অ্যান্ড আই অ্যানসার উইথ শ্যাডোওস।’ এক এক রাতের গল্প বলা হচ্ছে যেখানে তিনি তাঁর গভীরতম ভয় এবং আকাঙ্খা প্রকাশ করেছেন। কবিতায় তিনি অনুভূতির এক ভ্রমণকাহিনীর বর্ণনা করেছেন। এখানে শৃঙ্খল ভঙ্গ ‘ডেলিবারেট’ অর্থাৎ ইচ্ছেকৃতভাবে তৈরি। ঠিক যেমন ‘রকস্টার’ সিনেমায় রণবীর কপূর করছেন। না মানার মধ্যে দিয়েই নিজের না পাওয়া, ক্ষোভ এবং প্রতিবাদের চিৎকারে কাঁপিয়ে দিচ্ছেন ত্রিভুবন।
মরিসনের কবিতা আসলে একটা অন্ধকার ঘরের ছবি। সেখানে ছায়া এবং আলো এসে মিশে যাচ্ছে। তাঁর হাতে যে কলম সেখান থেকে আগুনের ঝলকে ঝলসে যাচ্ছে চারপাশ। নিঃসঙ্গ এক কবি এক মানচিত্র আঁকছেন কিন্তু বাইরে লস অ্যাঞ্জেলসের আলো, ভিড়, শব্দ। কিছুই তাঁর মনোযোগ নষ্ট করতে পারছে ন। তাঁর লেখা দ্য অ্যান্ড’ বা ‘রাইডার্স অন দ্য স্টর্ম’-এ মৃত্যু, প্রেম, নিঃসঙ্গতা, সবই শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
আরও পড়ুন: https://bengalpedia.online/rcb-beat-pbks-in-ipl-2026/
‘পুশ বিয়ন্ড দ্য ওয়ালস, হোয়্যার নাথিং হোল্ডস, অ্যান্ড ইউ আর ফ্রি।’ এখন থেকে তাঁর বিদ্রোহ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। যে বিদ্রোহ শুধু রাজনৈতিক নয়, অনেকটাই সামাজিক এবং ব্যক্তিগত। মানুষের অন্তরের যুদ্ধকেই যেন তিনি বারবার তুলে ধরেছেন। চিরকাল নিঃসঙ্গতাকে স্বীকৃতি দিতে দিতে এবং বিদ্রোহ দিয়ে মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করার পর অল্প বয়সেই বিদায় জানালেন এই জাগতিক সংসারকে (Jim Morrison)।
১৯৭১ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে মরিসন চলে যান। তার মৃত্যু নিয়ে কিছু রহস্য রয়েছে আজও। কিন্তু তার কবিতা, গান এবং ‘পারসোনা’ চিরকাল আমাদের মনে দাগ রেখে যাবে। মানুষের অন্তর যতই বিভক্ত হোক না কেন, শিল্প এবং শব্দের মাধ্যমে সেই বিভাজনকে মিলিত রূপ দেওয়া যায়।
জিম মরিসন এবং জর্ডন দুজনেই ছিলেন পুরোদস্তুর কবি, ভবঘুরে, বিদ্রোহী। তিনটি পরিচয় একসঙ্গে মিশে গিয়ে তৈরি করেছে এই দুই রকস্টারের ‘পারসোনা’। তাঁর কবিতা ও গান চিরায়ত এবং আইকনিক। এই দুইজনকে মিলিয়ে দিয়েছেন ইমতিয়াজ আলি। এখনও সেই ১৮ বছরের ছেলেটা রোজ স্বপ্ন দেখে গান গেয়ে বিশ্ব জয় করার (Jim Morrison)।
