Socrates

Socrates: সক্রেটিস, ফুটবল ময়দানে এক বিপ্লবী! আন্দোলনের মহীরুহ

বেঙ্গলপিডিয়া অনলাইন: ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী সক্রেটিস, যিনি একদিকে ছিলেন ডাক্তার, একদিকে বিপ্লবী এবং আরেকদিকে ফুটবল ময়দানের সম্রাট (Socrates)।

ফুটবল ইতিহাসে বিপ্লবী ফুটবলার (Socrates)

আজকের ব্রাজিল যেমন ফুটবলের জন্য পরিচিত তেমন এক সময় এমনটা ছিল না। ফুটবল তখন ছিল বেঁচে থাকার কারণ আবার কখনও কখনও এক বিপ্লব। সালটা ১৯৬৫ থেকে এর সূত্রপাত, প্রায় বছর কুড়ি ব্রাজিল তখন স্বৈরশাসনের কবলে। সেই সময়ের এমন এক ঘটনা ঘটে যা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল আর সেটা হল ব্রাজিলের পারা নামক এক জায়গায় রেইমান্ডো নামের একজন লোক তাঁর অতি কষ্টে গড়ে তোলা বাড়ির লাইব্রেরি নিজের হাতে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন (Socrates)।

তিনি ছিলেন গ্রিক দার্শনিকের একনিষ্ঠ ভক্ত। তাঁর সন্তান দেখেছিলেন তাঁর পিতা নিজের হাতেই পুড়িয়ে দিচ্ছেন তাঁর প্রাণ প্রিয় লাইব্রেরি। সেই বাবা তাঁর সন্তানের নাম রেখেছিলেন সেই গ্রিক দার্শনিকের নামে যাঁকে বিশ্ব চেনে সক্রেটিস নামে। তিনিও ছেলের নাম রাখলেন সক্রেটিস। আর সেই তখন থেকেই বোধহয় তাঁর বুকের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল আগ্নেয়গিরি।

শিলাজিতের খুব বিহ্যাট এক গানের লাইন ধরে বাকি লেখায় ঢুকছি সর সেই লাইনটি হল, ‘বুকে আমার বারুদের বাসা সজনী, স্পাইনাল কর্ড দিন-রাত্রি সলতে’। সেই বুকে বারুদের স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে বড় হয়ে ওঠা এই মহীরুহর। তিনি ছিলেন মেডিক্যালের ছাত্র। ব্রাজিল ফুটবলের এক বিশেষ বৈশিষ্ট হল সেখানে ১৪-১৫ বছর বয়সে খেলা শুরু করে ১৮ বছরের মধ্যেই সিনিয়র দলে জায়গা পেয়ে যান। তবে তিনি যোগ দেন কিছুটা পরে ২১ বছর বয়সে। তবে এর পাশাপাশি ডাক্তারি পড়া ছাড়েননি তিনি। অন্যদিকে তিনি খেলার জন্যও পরিচিত হতে শুরু করেন (Socrates)।

১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর ব্রাজিলে দুটো ধারা আসে, একদিকে চিরাচরিত ল্যাটিন জয় পরাজয় যা-ই হোক আবার অপর দিকে ইউরোপীয় ঘরানার খেলা। তবে সক্রেটিস চিরাচরিত ব্রাজিলিয়ান সাম্বা ফুটবলের ভক্ত। পজিশন ছিল এটাকিং মিডফিল্ডার, তবে গোল করায় ছিলেন অসম্ভব দক্ষ। পুরো দলের খেলা একাই চালনা করতেন মিডফিল্ড থেকে। তাঁর অসম্ভব সুন্দর পায়ের কাজ ছিল শিল্প। নিখুঁত শটে এঁকে দিতেন ম্যাচের গতিপথ। এমনকি নিজের লুকের কারণেও হয়ে ওঠেন সেনসেশন।

জিকো, ফ্যাল্কাওদের সেই যুগে, যে প্রজন্মকে ব্রাজিল ইতিহাসেরই সেরা প্রজন্ম বলা হয়, সেই প্রজন্মেরই মুখ হয়ে উঠেন ‘কুল সেনসেশন’ সক্রেটিস। ১৯৭৯ সালে সক্রেটিস করিন্থিয়ান্সে আসেন। সেটা ছিল তথাকথিত ‘শ্রমিক’ ঘরনার ক্লাব। সেখান থেকেই তিনি গণত্রন্ত্র প্রতিষ্ঠানের কাজে জোর দিতে থাকেন। সঙ্গী হিসেবে পান প্লেয়ার পালিনহা, ক্যাসাগ্রান্দেদের। সেই সময় কিন্তু ব্রাজিলে রাজনৈতিক নির্বাচন হয় না। তবে ডিরেক্টরের অনুমতিতে সেই ক্লাব থেকে সক্রেটিস শুরু করেন ভোটভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের। এর ফলে ক্লাবে সবাই সমান গুরুত্ব পেতে শুরু করেন। এক ক্লাব তখন বুক ছিটিয়ে যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করছে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে (Socrates)।

আরও পড়ুন: https://bengalpedia.online/lionel-messi-mbappe-haaland-scores-in-world-cup/

আরও পড়ুন: https://bengalpedia.online/fifa-world-cup-controversial-moment/

এই ক্লাবে থাকাকালীন জীবনের অসাধারণ সময় কাটান তিনি। পাঁচ বছর সেই ক্লাবের হয়ে করেন ১৭২টি গোল। বিশ্ব ফুটবলে ততদিনে তাঁর খেলার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সেই সময় তাঁর যাত্রাপথ সুখের নয়। ১৯৮২ সালে স্পেন বিশ্বকাপে ব্রাজিল যায় তাঁর ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল নিয়ে বা জেক ব্রাজিল বেস্ট বলা হয়। এডার, ফ্যালকাও, জিকোদের নিয়ে দলটা ছিল এককথায় বেস্ট। সক্রেটিস সেই দলেই ক্যাপ্টেন। স্পেন বিশ্বকাপে ব্রাজিল প্রদর্শন করল শৈল্পিক ফুটবল। এই দলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গেই সারা বিশ্বে।

সক্রেটিসরা খেলতেন মূলত মনের আনন্দের জন্য। জেতার খিদে ততটা তাঁর ছিল না। গোলচিল উচ্চ মানের শিল্প। সেই বিশ্বকাপে সক্রেটিসের করা গোলগুলো সব ছিলো লং শটে। ঝামেলা লাগলো ইতালির সাথে ম্যাচে এসে, নকআউট এই ম্যাচে শুরুতেই দু’গোল করে বসে ব্রাজিল, ইতালি সেই বিশ্বকাপে ফেভারিট কেউ না। পুরো বিশ্ব যখন ইতালির পরাজয়ের মাত্রা কষছে, তখন সদ্য কারামুক্ত স্ট্রাইকার পাওলো রসি দ্বিতীয়ার্ধে হ্যাটট্রিক করে বসেন (Socrates)।

যখন স্কোর রয়েছে ২-২, সেই সময় ব্রাজিল অলআউট অ্যাটাকে গেছে, অথচ আজকের কেউ হলে ডিফেন্সিভ খেলে ঠিকই ২-০ লিডকে জয়ের রূপ দেয়। কিন্তু সেই সময়ের ব্রাজিল দেখিয়েছিল মনের আনন্দে জীবনের অঙ্ক না কষে মাঠের সময়টা উপভোগ করা। তবে সেই আনন্দ আর ব্রাজিলবাসী পায়নি। ব্রাজিলের ইতিহাসে এই দলটা খেতাব পেয়ে যায় ‘The Best Brazil Team Not to Win World Cup’ (Socrates)।

ট্র্যাজেডির শিকার হয় যার রেশ কাটেনি পরবর্তী ১২ বছরেও। তবে ইতিহাসের অন্যতম সেরাদের তালিকায় ঠিকই জায়গা করে নেয় এই দলটি। কিন্তু সক্রেটিস? একটা দল তত সুন্দর যত সুন্দর তাঁর মিডফিল্ড। ব্রাজিল মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা সক্রেটিসের খেলার কথা আর বিশেষ করে বলতে হয় না। স্প্যানিশ মিডিয়া তাকে আখ্যা দিয়েছিল ‘Not Athlete, Just Artist’ বলে। ফুটবল কেরিয়ার যদি বলা যায় তবে সেক্ষত্রে তাঁর নামের পাশে বড় কোনও রেকর্ড নেই। ব্যক্তিগত কোনও রেকর্ড নেই। দলের ক্ষেত্রে বিশ্বকাপ বা কোপা নেই তবু তিনি শ্রেষ্ঠ। তিনি উত্তাল ব্রাজিলের হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা।

১৯৮২ সালে এক কাপ ফাইনালে তাঁরই জোরাজুরিতে দল যে জার্সিতে খেলতে নামবে সেখানে ‘Democracia’ শব্দটি প্রিন্ট করা ছিল, আর এই একটি শব্দ পুরো ব্রাজিলে আলোড়ন ফেলে দেয়। স্টাইলিশ দাড়ি আর লম্বা চুলের ‘কুল সেনসেশন’ হয়ে দাঁড়ায় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদের জাতীয় প্রতীক। মাঠে ব্রাজিলের সেরা মিডফিল্ডার আর মাঠের বাইরে জান্তাবিরোধী মুখ এই ভাবেই তাঁর এক স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হল।

১৯৮৪ সালে ‘ডাইরেটাস জা’ নামে ব্রাজিলে একটি বিশাল গণ-আন্দোলন হয়, এর উদ্দেশ্য ছিল মুক্ত নির্বাচন আয়োজন। ঠিক সেই সময়টাতে ইতালিয়ান জায়ান্ট দল ফিওরেন্টিনা তাকে দলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। সেই গণ-আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ক্যাথেড্রাল স্কয়ারে প্রায় আড়াই মিলিয়ন মানুষের সামনে ‘করিন্থিয়ান্স ডেমোক্রেসি’র প্রতীক সক্রেটিস ভাষণ দিচ্ছেন সেই সময় সেই ভাষণের উত্তপ্ত শব্দ মানুষের মনে তৈরি করছে তীব্র আলোড়ন।

খুব কড়া ভাষায় জান্তা সরকারকে তুলাধুনা করে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতেই ফেলে দেন। বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, এই আন্দোলন যদি সরকার মেনে নেন তবে ব্রাজিল ছেড়ে তিনি ইতালিতে খেলতে যাবেন না। পুরো ক্যাথেড্রাল স্কয়ার সোল্লাসে ফেটে পড়ে। বলে রাখা ভাল, তখন ব্রাজিলিয়ানরা সহজে ইউরোপে যেতে চাইতো না, ব্রাজিল লীগই ছিল সেই সময় দারুণ শক্তিশালী (Socrates)।

কিন্তু জান্তা সরকার আন্দোলনে সায় দিল না, সক্রেটিস করিন্থিয়ান্স ছেড়ে চলে গেলেন ফিওরেন্টিনায়। সক্রেটিস আসার পরে ফিওরেন্টিনার মাঠে দর্শক সংখ্যা বাড়তে লাগল। তবে ইতালিয়ান লীগ বরাবরই আল্ট্রা-ডিফেন্সিভ লীগ, ম্যান মার্ক আর টাফ ট্যাকেলের লীগে সৌন্দর্যের এতটা স্পর্শ ছিল না বললেই চলে ছিল না। সক্রেটিস এত ভাল করতে পারলেন না। এক সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, মাজ্জোলা না রিভেরো (সেই আমলে ইতালির দুই সেরা প্লেয়ার) কে তাঁর বেশী পছন্দের? তাঁর জবাব ছিল, ‘আমি তাদের খেলা দেখার সময় পাই না, নিজের খেলা বাদ দিয়ে বাকি সময়টা ইতালির শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে পড়াশোনা করি।’ আজকের দিনে এমন বক্তও রাখতে পাড়ার মত মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিনই শুধু নয় কার্যত একপ্রকার অসম্ভব (Socrates)।

অবসরের পর কয়েকটি ক্লাবে কোচিং করান সর্বকালের এই সেরা মিডফিল্ডার। এরপর মেডিকেল প্র্যাকটিস করতে থাকেন, গরীবদের ফ্রিতে চিকিৎসা সেবা দিতেন। ফিফা তাকে বিশেষ দূত করার প্রস্তাব দিলে তিনি তা ফিরিয়ে দেন, দুর্নীতির টাকায় বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধী ছিলেন এই প্রতিবাদী মুখ। লিবিয়ার নেতা কর্নেল গাদ্দাফি নিজে তাকে বলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াতে। প্রচন্ড জনপ্রিয়তা নিয়েও তিনি দাঁড়াননি। তিনি কোন দলের কন্ঠ হতে চাননি, হতে চেয়েছেন পুরো দেশের কন্ঠ, যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কলম সোচ্চার হয়েছে সবসময়।

ফুটবল বিশ্বে তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার, ব্রাজিলের গণতন্ত্রকামীদের কাছে তিনি আইকন, জীবিতাবস্থায় সমাজের কাছে ছিলেন বুদ্ধিজীবী, না আজকের যে বুদ্ধিজিবী বললে অনেকেই বক্র দৃষ্টিতে তাকান তিনি সেই দলে পড়েন না। তবে যে মানুষ নিজের বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে কোনও কাজ করেন তাঁকেই এই তকমা দেওয়া যেতে পারে, এর জন্য বিশেষ কোনও পেশা বা পড়াশোনার প্রয়োজন পড়ে না।

একজন ফুটবলার, যার আইডল কোনও ফুটবলার নন, বরং জন লেনন, ফিদেল ক্যাস্ট্রো আর চে গুয়েভারা, এতেই বোঝা যায় তিনি ফুটবলারের চেয়েও বড় কিছু, তিনি শুধু ফুটবল খেলতে আসেননি। তাঁর ইচ্ছা ছিল তিনি মারা যাবেন প্রিয় ক্লাব করিন্থিয়ান্সের লীগ জয় দেখে দেখে। ২০১১ সালে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে অতিরিক্ত ধূমপানের কারণে তিনি যেদিন মারা যান, তার কয়েকদিন আগেই লীগ জয় প্রায় নিশ্চিত করে ফেলে করিন্থিয়ান্স। যে সন্ধ্যায় তিনি মারা যান, তার পরের দিনই লীগ ট্রফি হাতে নেয় তাঁর প্রিয় ক্লাব। এভাবেই দশ বছর বয়সে বাবার লাইব্রেরী পুড়তে দেখা যে ছেলেটার মনে জন্ম নিয়েছিল আগ্নেয়গিরি সেই ছেলেটি হয়ে দাঁড়ায় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে মহীরুহ।

যিনি আজন্ম লড়ে গেছেন শোষিত শ্রেণীর মানুষদের হয়ে। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পড়ার আগ পর্যন্ত অবহেলিত-নিপীড়িত মানুষদের হয়ে কথা বলেছেন। নিজের অবসরের পর পুরোদমে একজন ডাক্তার ও ফুটবলবোদ্ধা হিসেবে মিডিয়ায় কাজ করেন। ফুটবলের পাশাপাশি সমাজের অন্যায় অবিচার নিয়েই নিয়মিত লিখতেন তাঁর কলামে।

২০১১ সালে শেষ দিকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হোন। পরের মাসেই যকৃত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে কাটান আরও ১৭ দিন। এরপর ডিসেম্বরের ১ তারিখ সাও পাওলোর এক হোটেলে পরিবারে সবাই মিলে ফুড পজিনিংয়ের শিকার হয়ে যান, বাকিরা বেঁচে গেলেও তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে পৃথিবী ছাড়লেন। শেষ হল এক ফুটবল বিপ্লবীর যুদ্ধ। যাঁর প্রয়াণে শুধু তাঁর পরিবার নয় বরং সকল মানুষ জাতি-ধর্ম-পেশা নির্বিশেষে চোখের জল ফেলেছিলেন।

তার মৃত্যুতে ব্রাজিলে সাবেক প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ বলেন, ‘ব্রাজিল তার সবচেয়ে পছন্দের ছেলেগুলোর মধ্যে একজনকে হারিয়েছে। মাঠে তার প্রতিভা ও অসাধারণ পাসের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন ফুটবল জিনিয়াস। মাঠের বাহিরেও তিনি ছিলেন এক সক্রিয় নেতা। ব্রাজিল এবং তার জনগণের সাথে তার সম্পর্ক ছিল অন্যরকম (Socrates)।’

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *